মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ.-এর কাঙ্ক্ষিত পূর্ণাঙ্গ কারিকুলাম

মাওলানা খলীলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী

বর্তমান সময়ে জাতির জন্য দুই শ্রেণির ব্যক্তির বড় প্রয়োজন। প্রথমতঃ এমন উলামায়ে কেরামের, যারা একদিকে খোদাভীতি ও পবিত্রতায়, ইখলাস ও নিষ্ঠায়, ইলমের গভীরতা ও কর্মের স্বচ্ছতায় পূর্বসূরি আকাবির ও আসলাফের উত্তম আদর্শ এবং তাঁদের রুচি ও স্বভাবের রক্ষক ও ধারকবাহক হবেন। অন্যদিকে যুগের চাহিদা, জাতির স্বভাব এবং জেনারেল শিক্ষিত শ্রেণি, বিশেষত; যুবকদের অস্থিরতা ও মনমানসিকতা, রুচি ও কালচার গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন এবং তাদেরকে তাদের ভাষায় সম্বোধন করতে পারবেন। সাথে সাথে ইসলামকে এভাবে পেশ করতে সক্ষম হবেন যে, সাধারণ শিক্ষিত লোকদের অন্তরেও ইসলাম একটি সহজাত ধর্ম এবং জীবনের সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান হওয়ার পূর্ণ বিশ্বাস অর্জিত হবে এবং তাঁদের মেধা ও মননে, চিন্তা ও চেতনায় বিকৃত সমাজের জন্য রাগ ও ঘৃণার পরিবর্তে সহানুভূতি ও মঙ্গল কামনার ইতিবাচক আবেগ প্রাধাণ্য পাবে। তাঁরা অগাধ প্রেম ও ভালোবাসা এবং হৃদয়ের জ্বালা ও ব্যথা নিয়ে শুধুমাত্র মুসলিম সমাজে নয়; বরং গোটা দেশ ও মানবতার সামনে সর্বোত্তম পন্থায় ইসলামের অমীয় বাণি ও ভালোবাসার পয়গাম, কথা ও বাণি এবং কর্ম আদর্শের মাধ্যমে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন।

দ্বিতীয়তঃ এটিও আমাদের একটি জাতীয় প্রয়োজন যে, আইন-কানুন, নিয়ম-শৃঙ্খলা, সিভিল সার্ভিসেস, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য…এই সকল বিভাগে যারা যান, তারাও যেন ‘নিজেকে মুসলমান বানিয়ে’ সেখানে যান এবং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং সকল বিভাগে কর্মদক্ষতার সাথে সাথে ঈমানদারী, সততা ও জনসেবার আবেগের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবেন। তাদের একান্ত বিশ্বাস হবে যে, আমাদের এই পেশাদারী ব্যস্ততা কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জনসেবা, দীনের প্রচার-প্রসার ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমও বটে। ‘দারুল উলূম ইমামে রব্বানী’ মূলতঃ এই দুই প্রকারের লোক তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তার পাঠ্যসূচি, শিক্ষা-দীক্ষা, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-আশাক, আবাসিক নিয়মাবলী, ২৪ ঘণ্টার সময়সূচি, খেলাধুলা, শরীর চর্চা ইত্যাদির সু-ব্যবস্থা; সবকিছু এই প্লান ও টার্গেটকে সামনে রেখে সাঁজানো হয়েছে। ‘উত্তমের চেয়ে উত্তমের খুঁজ’ ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে। একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, দীনি ইলম অর্জন করা কেবল অসহায়, দরিদ্র ও গ্রাম্য পরিবারের সন্তানদের দায়িত্ব নয়, বরং উচ্চাভিলাষী ও স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্যও কুরআন-হাদিসের ইলম দ্বারা নিজেদের মেধা ও মননকে আলোকিত করার সুযোগ থাকা চায়, …[বুদ্ধিমানদের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট]

উল্লিখিত ‘বক্তব্যাংশ’ উক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র [Prospectus]-এর শুরুতে আমার লিখিত ‘পরিচিতি প্রবন্ধ’ থেকে হুবহু সংগৃহীত।

আজকের এই সম্মেলনে আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি [Education Policy] সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে চাই।

আমাদের শিক্ষাপদ্ধতির ইতিকথা

উনবিংশ শতাব্দীতে ভারত উপমহাদেশের পাশ্চাত্য শক্তির সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয়ের পর যখন এই আশঙ্কা সুদৃঢ় হতে চলছিল যে, উপমহাদেশ থেকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রাচ্য সাহিত্য-সংস্কৃতি বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে এবং গোটা জাতিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দাস ও খৃস্টান ধর্মের অনুসারীতে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিশালী রাজ্য নিজেদের সর্বশক্তি ও পূর্ণ প্রতিজ্ঞা নিয়ে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালিয়ে যাবে। কার্যতঃ এই প্রয়াস শুরুই হয়ে গিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে শাহ ওলী উল্লাহ রহ.-এর সিলসিলার সাথে সংশিّষ্ট কয়েকজন উলামায়ে কেরাম ইসলামী সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে এবং উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে ধর্মত্যাগ ও মুরতাদ হওয়া থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে একটি ছোট্ট গ্রাম ‘দেওবন্দ’-এ ‘কেল্লায় অবস্থান’ কর্মসূচী গ্রহণ করেন। উলেস্নখ্য যে, এই ভাষাটি হল মুফাক্কিরে ইসলাম হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর। তিনি এ সকল উলামায়ে কেরামকে দীনের গভীর ইলেমের অধিকারী, মুত্তাকী

ও খোদাভীরু, মুখলিস ও নিষ্ঠাবান এবং দীনি আবেগ ও আল্লাহর পথে বিসর্জন দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলামী বিশ্বের সর্বোচ্চ বীর সেনানী ও নির্ভিক ধর্মীয়গুরু এবং দীনের অন্যতম ধারকবাহক আখ্যায়িত করে লিখেন :

তাঁরা দীনি আবেগ, ইসলামের রূহ, মুসলিম জীবনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য এবং ইসলাশী সংস্কৃতির অবশিষ্ট নির্দশনাবলীকে রক্ষার প্রত্যয় ও প্রয়াস আরম্ভ করেন এবং ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য ‘কেল্লায় অবস্থান’ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেন সেই কেল্লাসমূহে [যেগুলোকে আরবী মাদরাসা বলা হয়] ইসলাম প্রচারক ও দীনের মুবাল্লিগ তৈরির কাজ অব্যাহত রাখা যায়। {মুসলিম দেশে ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব : ৮৮}

হযরত মাওলানা আলী মিয়াঁ নদভী রহ. আরো লিখেন;

এই মহান সংস্কারমূলক আন্দোলন ও শিক্ষা বিপ্লব [যা ১২৮৩ হিজরী/১৭৬৬ ইং সনে আরম্ভ হয়েছিল]-এর মূল নেতৃত্বে ছিলেন হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ.’।

এখানে এই কথাটি ও স্পষ্ট করে দেয়া উচিৎ মনে করছি যে, এই সকল উলামায়ে কেরাম ব্রিটিশ সরকারের ইচ্ছা ও প্লানের ব্যাপারে যে আশঙ্কা করেছিলেন তা শতভাগ বাস্তব ছিল এবং এটি তাঁদের দূরদর্শিতা, প্রেক্ষাপটের সঠিক অনুধাবন ও গভীর পর্যবেক্ষণের খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ বহন করে।

সবিস্তারে জানার জন্য ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল ‘লর্ড মেকালে’-এর ভাষণ ও বক্তব্য, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ এবং রিপোর্ট ও সিদ্ধান্তগুলো অধ্যয়ন করুন।

দারুল উলূম দেওবন্দের প্রাচীন সিলেবাস

আসুন, দারুল উলূম দেওবন্দের এই মহান প্রতিষ্ঠাতাগণ ঐ সময়ে যে পাঠ্যসূচী নিজেদের প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করেছিলেন তা একটু পর্যবেক্ষণ করি। এই বুযুর্গগণ মূলতঃ শাহ ওলী উল্লাহ রহ.-এর ঘরানার উত্তরসূরী ছিলেন, তাঁরা দিলস্নী কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং খায়রাবাদের উলামায়ে কেরামের নিকট মা’কুলাতেও (যুক্তিবিদ্যা] পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই উচ্চ পর্যায়ের সরকারী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও উচ্চপদে সমাসীন হওয়ার অভিজ্ঞতাও লাভ করেছিলেন। তাই, তাঁরা মাদরাসার জন্য যে পাঠ্যসূচী নির্ধারণ করেন তাতে ঐ সকল সম্পর্ক [নিসবত] ও ইলমের ফোয়ারা থেকে উপকৃত হওয়ার প্রতি বিশেষ নজর রাখেন। শিশু-কিশোরদের মেধা ও মনন, চিন্তা ও চেতনাকে বিকাশকারী বিভিন্ন শাস্ত্র ও ফন সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

দারুল উলূম দেওবন্দের প্রাথমিক পাঠ্যসূচীতে একদিকে আরবী, ফার্সী, ইসলামী শাস্ত্র [কুরআন, হাদীস, ফিকাহ ইত্যাদি] বাধ্যতামূলক ও মৌলিক বিষয় হিসাবে রাখা হয়েছিল, অন্যদিকে গণিত [Mathematics] জ্যামিতি [Geometry] জ্যোতির্বিদ্যা [Astronomy] ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাঠ্যসূচির বিস্তারিত বিবরণ দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম বর্ষের রেজুলেশনে দেখতে পারেন।

হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. ১২৯০ হিজরী/জানুয়ারি ১৮৭৯ ইং সনে দারুল উলূম দেওবন্দের বার্ষিক সভায় মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন, সেই বক্তব্যের নিম্ন প্যারাগ্রাফের ওপর একান্ত মনোনিবেশ করুন। তিনি বলেন,

উক্ত মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া প্রধান লক্ষ্য ‘যোগ্যতা’ সৃষ্টি করা। কেবল দীনি শিক্ষা নয়, বরং পূর্বের নীতি অনুযায়ী ‘মেধা বিকাশ’ শাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গতার প্রতিও মনোনিবেশ করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে তার উত্তম ফলাফল এভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যে, যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে তীব্র মেধার অধিকারী, বড় বড় আল্লামা ও ইসলামিক স্কলারস প্রচুর হারে তৈরি হয়েছিল।

এখানে হয়ত কারো কারো নিকট এই বিষয়টি অস্পষ্ট যে, হযরত নানুতুবী রহ. ‘মেধা বিকাশ শাস্ত্র’ বলে কি বুঝাতে চেয়েছেন? তাই আসুন তাঁরই ভাষায় এর ব্যাখ্যা শুনুন। তিনি একটু পরে বলেন,

মাকুলাত’ বা ‘মেধা বিকাশ শাস্ত্র’ বলে কেবল তর্কশাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র উদ্দেশ্য নয়, বরং তাতে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, মহাবিশ্ববিজ্ঞান, পাটিগণিত ও দর্শনশাস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত। -দারুল উলূম দেওবন্দের রেজুলেশন : ১২৯০ হি. এবং মুতামিরুল আনসার মুরাদাবাদ : ১৩২৯ হি. এবং ‘আল-কাসেম’-এর দারুল উলূম দেওবন্দ সংখ্যা : ১৩৬০ হি.

লক্ষ্য করুন, হযরত নানুতুবী রহ.-এর বর্ণনা মতে, যে শাস্ত্রগুলো ‘মেধা বিকাশ শাস্ত্র’-এর অংশ এবং যা দারুল উলূম দেওবন্দের পাঠ্যসূচী অন্তর্ভুক্ত ছিল তা হলো;

Mathematicsحسابগণিত
Arithmeticرياضىপাটিগণিত
Astronomyهئيتজ্যোর্তিবিদ্যা
Cosmologyفلكياتমহাবিশ্ববিজ্ঞান
Metaphysicsالهياتদর্শনশাস্ত্র

তৎকালীন সময়ের দারুল উলূম দেওবন্দের রেজুলেশন অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, দারুল উলূম দেওবন্দের পাঠ্যসূচীতে বীজগণিত, ভূতত্ত্ববিদ্যা, জ্যামিতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অভিজ্ঞ শিক্ষকম-লীকে অবশ্যই জেনে রাখা উচিৎ যে, এখানে হযরত নানুতুবী রহ. এ সকল শাস্ত্রকে যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যম ও ‘মেধা বিকাশ শাস্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি একজন আলেমেদীন, শিক্ষক ও আল্লাহওয়ালাই ছিলেন না, বরং তিনি মহান শিক্ষা বিশেষজ্ঞও ছিলেন। তাঁর দৃষ্টি ইলম ও ইশক, জ্ঞান ও খোদাপ্রেমের সাথে সাথে মেধার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং বুদ্ধির তীব্রতা ও চিন্তা-গবেষণার যোগ্যতা সৃষ্টিকারী বিষয়ের প্রতিও পূর্ণ নিবদ্ধ ছিল।

মেডিকেল সায়েন্সের শিক্ষা

লক্ষ্য করুন, তৎকালীন মেডিকেল সায়েন্সের জন্য ‘ইউনানী তিব’ বা গ্রীক স্বাস্থ্যবিদ্যার প্রচলন ছিল। দারুল উলূমের সূচনাতেই মেডিকেল সায়েন্সের প্রাথমিক শিক্ষা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা যথেষ্ট মনে করেননি, কেননা তাদের ইচ্ছা ছিল গ্রীক স্বাস্থ্যবিদ্যার উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা। পরিশেষে ১২৯৫ হিজরীতে তার ব্যবস্থা নেয়া হয়। তার ঘোষণা ১২৯৫ হিজরীর রেজুলেশনে নিম্নরূপ উলেস্নখ করা হয়; অতীতের অবস্থা থেকে এই মাদরাসার সকল কল্যাণকামীগণের নিকট স্পষ্ট যে, অনেক ছাত্র এই মাদরাসা থেকে দীনি জ্ঞানে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন [আলিম-ফাযিল হয়েছেন] ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু এই মাদরাসার মজলিসে শুরার সদস্যগণ যখন মুসলিম জনসাধারণের জন্য অন্যান্য কল্যাণ ও সেবামূলক কাজের প্রতি গভীর মনোনিবেশ করলেন, তখন তাঁরা একটি প্রচুর লাভজনক কাজ তথা গ্রীক স্বাস্থ্যবিদ্যার প্রচলন ও পূর্ণাঙ্গতার ঘাটতি অনুভব করলেন। তাই এর ব্যাপক প্রচার-প্রসার ও পূর্ণতা সাধনকে কেবল প্রয়োজন নয় বরং অবশ্যকর্তব্য মনে করলেন। কেননা, তাতে সাধারণ জনগণের অনেক উপকার নিহিত রয়েছে।

রেজুলেশনের উল্লিখিত পাঠ ও ‘ইবারতের’র মধ্যে গভীরভাবে চিন্তা করলে আপনি বুঝতে পারবেন যে, দীনি শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে মাদরাসার কার্যক্রম ও তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ ও হিতাকাঙ্ক্ষীগণ তো সন্তুষ্ট ছিলেন, তা সত্ত্বেও মজলিসে শূরার সদস্যগণ প্রয়োজন বোধ করছিলেন যে, এখানে যদি মেডিকেল শাস্ত্রেরও শিক্ষা দেয়া হয় তাহলে আমাদের ছাত্ররা অনেক বড় আকারে সমাজের খেদমত আঞ্জাম দিতে পারবেন। তাদের অন্তরে এই ‘জনকল্যাণের’ এত প্রবল অনুভূতি ছিল যে, কেবল এটার ভিত্তিতেই মেডিকেল সাইন্সের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থাপনাকে নিজেদের আবশ্যকীয় দায়িত্ব মনে করেছিলেন, বরং ১৩৮৬ হিজরীর রেজুলেশন থেকে বুঝা যায় যে, সামর্থ্যের শর্তে [Surgary and pharmacology] সার্জারি ও ঔষুধ তৈরি প্রশিক্ষণেরও প্রোগ্রাম ছিল।

দারুল উলূমের তৎকালীন শিক্ষার মান

এই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোন মানের শিক্ষা দারুল উলূম দেওবন্দে দেয়া হত? চলুন, তা সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের এক প্রতিনিধির অভিমত শুনি; ভারতের উত্তর প্রদেশের গভর্নর স্যার জন স্ট্রেছি [Ser john strache] ৩০ জানুয়ারী ১৮৭৫ ইংরেজী সনে দেওবন্দে অবস্থান করেন। গভর্নর সাহেব তার বন্ধু ও উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ‘জন পামর’কে বলেন, এখানে মুসলমানরা একটি মাদরাসা আরম্ভ করেছে, তুমি ছদ্দবেশে সেখানে যাও এবং তার শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হও। ‘জন পামর’ মাদরাসার পূর্ণ পর্যবেক্ষণের পর যে রিপোর্ট পেশ করছেন তার নির্বাচিত অংশ পড়ুন।

এক স্থানে খুবই সুন্দর ও মধ্যম গঠন বিশিষ্ট এক ব্যক্তি বসা ছিল, সামনে বয়স্ক ছাত্রদের একটি কাতার; কাছে গিয়ে দেখলাম, [ইলমে মুসাল্লাস] ত্রিকোণমিতির আলোচনা হচ্ছিল। আমি মনে করেছিলাম আমাকে অচেনা মানুষ মনে করে তারা বিচলিত হবে কিন্তু দেখলাম কেউ কান ধরনের ভ্রুক্ষেপও করেনি। -মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে একজন ইংরেজ জেন্টলমেন্ট এসে বসে যাওয়া এবং ছাত্র-শিক্ষক কারো সেদিকে মনোনিবেশ না করা! হায়রে একাগ্রতা! আহ অমুখাপেক্ষীতা! এই ছোট্ট ঘটনা থেকেও আমাদের অনেক কিছু শিখা উচিৎ।

আমি নিকটে গিয়ে বসে গেলাম এবং শিক্ষকের পাঠ শুনতে লাগলাম। আমি অবাক হলাম, যখন আমি দেখলাম ত্রিকোণমিতির এমন জটিল নিয়মাবলীর বিবরণ দেয়া হচ্ছে যা আমি কখনো ড. ইস্প্রীঙ্গার -[তিনি একজন প্রাচ্যবিদ, যিনি দিলস্নী কলেজের প্রিন্সিপালও ছিলেন এবং তিনি আল্লামা ইবনে হাজার রহ.-এর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আল-ইসাবা’ ও আল্লামা সুয়ূতী রহ.-এর ‘আল-ইতক্বান’ ও কাজী আলী রহ.-এর ‘কশ্‌শাফু ইসতিলাহাতিল ফুনুন’ কিতাবাদী সর্বপ্রথম এডিট করে প্রকাশ করেন।]-এর কাছে থেকেও শুনিনি।

এখান থেকে উঠে অন্য বিল্ডিং-এ গেলাম, তখন দেখলাম একজন মাওলানা সাহেবের সামনে সাধারণ পোশাক পরিহিত কিছু ছাত্র বসে আছে। এখানে ‘উকলিদস’-এর চতুর্থ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পদ্ধতির ধরণ বর্ণিত হচ্ছে। মাওলানা সাহেব নির্বিঘ্নে এমন বিবরণ পেশ করছিলেন, মনে হচ্ছিল যে, তিনি ‘উকলিদস’কে পূর্ণভাবে হজম করে নিয়েছেন।

এ ঘটনার বিবরণ দেয়ার পর আমাদের দেশের উলেস্নখযোগ্য গবেষক, উলামায়ে দেওবন্দ-সাহারানপুর ও শাহ ওলী উল্লাহ রহ.-এর সিলসিলার প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ মাওলানা নুরুল হাসান রাশেদ কান্দেলভী মন্তব্য লিখেন; এ অভিমত হল ঐ ব্যক্তির যিনি পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের পুতুল এবং ড. স্প্রীঙ্গার-এর মত বিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের শিষ্য।

হায়! আমাদের কাছে যদি এ প্রচলন ও ঐ সকল শাস্ত্রের এমন শিক্ষকের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকত এবং ‘মুনকুলাত’ [ইসলামী জ্ঞান] ও ‘মাকুলাত [সাধারণ বিজ্ঞান]-এর সকল বিভাগ ও বিষয় এক সাথে চলত, তাহলে আজ এই সকল মাদরাসা কেবল উলামা ও মুসলমানদের জন্য নয় বরং গোটা বিশ্বের অভিজ্ঞ শাস্ত্রবিদগণের আকাঙ্ক্ষা ও শিক্ষার মূলকেন্দ্রে পরিণত হত এবং আমি ভিন্ন, তুমি ভিন্ন এর পরিবেশ সৃষ্টি হত না। -মাসিক আল-ফুরকান : জুলাই ২০০৭ ইং

আল্লামা রশীদ রিজার পরামর্শ

আরেকটি ঘটনা শুনুন, ১৯২১ ইংরেজী সনে মিসরের প্রসিদ্ধ আলেমদীন আল্লামা রশীদ রিজা মিসরী সাহেব দারুল উলূম দেওবন্দে তাশরীফ আনেন। তখন তিনি তাঁর ভাষণে বলেন; ‘আমাদের মধ্যে এমন একটি দল তৈরি হওয়া জরুরি যারা ইসলামের ওপর আরোপিতসমূহ আপত্তি, বিশেষত ঐ সকল আপত্তি যা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে আরোপ করা হয়; তার সমুচিত জবাব দিতে পারবেন। কিন্তু এমন আপত্তির খণ্ড আধুনিক সায়েন্স ও বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন ব্যতীত সম্ভব নয়। তাই এই দলকে অববশ্যই আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে অভিজ্ঞ হওয়া জরুরি। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আপনারা এই ধারাবাহিকতা আরম্ভ করে দিয়েছেন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের একটি প্রাথমিক কিতাব النقش كالحجر নামক বইটি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আমার দৃষ্টি তে এই কিতাবটি যথেষ্ট নয়, তাই আমি আপনাদেরকে এমন কিছু কিতাবের সন্ধান দিব যা এর চেয়ে অনেক বেশি উপকারী। -দারুল উলূম দেওবন্দ রেজুলেশন : ১৩৩০ হিজরী চলুন, النقش كالحجرনামক কিতাব যা দারুল উলূম দেওবন্দের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল তার সূচিপত্রে একটু দৃষ্টি নিবন্ধ করি।

১ম অধ্যায়পদার্থবিজ্ঞানের প্রাথমিক তত্ত্বElements of physicsالمبادى العامة فى الطبيعيات
২য় অধ্যায়রাসায়নবিজ্ঞানChemistryالكيمياء
৩য় অধ্যায়পদার্থবিজ্ঞানPhysicsالجغرافية الطبيعية
৪র্থ অধ্যায়ভূগোলPhysical geographyالجغرافية
৫ম অধ্যায়ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানGeologyالجيولوجيا
৬ষ্ঠ অধ্যায়গৃহতত্ত্ব বিজ্ঞানAstronomyالهيئة
৭ম অধ্যায়উিদ্ভিদ বিজ্ঞানElements of physicsعلم النبات
৮ম অধ্যায়যুক্তিবিদ্যার মূলনীতিChemistryاصول المنطق

এখানে এই বিষয়টিও মনে রাখা উচিৎ যে, কিতাবটি এমন একজন আমেরিকান ব্যক্তি কর্তৃক লিখিত, যিনি আরব বিশ্বে খৃস্টান মিশনারীর সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিত্বকারী, বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির এবং বাইবেলের আরবী অনুবাদক। এটি এ কথার বড় প্রমাণ বহন করে যে, আমাদের এই সকল উলামায়ে কেরাম পশ্চিমা রাজনীতি ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কঠোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত জ্ঞানপ্রেমী ছিলেন।

শুনুন, পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে ইসলামরে ওপর যে সকল অভিযোগ আরোপ করা হয়েছে তার প্রতি উত্তরে সিরিয়ার এক বিজ্ঞ আলেম ‘শায়খ হুসাইন মুসতফা জিসির‘ الرسالة الحميدية في حقيقة الديانة الإسلامية وحقية الشرع المحمدي  নামক একটি চমৎকার কিতাব রচনা করেছিলেন, যাকে দারুল উলূম দেওবন্দের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। হযরত থানভী রহ. তার উর্দু অনুবাদ নিজ শিষ্য মাওলানা ইসহাক বর্ধমানী দ্বারা করিয়েছিলেন।

এই সকল বিবরণ দ্বারা একটি প্রশ্নের সু-উত্তর মিলে যায় যে, আমাদের এই মহান পূর্বসূরী আকাবেরের রুচি ও স্বভাব কি ছিল? তাঁদের শিক্ষা কারিকুলাম কি ছিল?

সিলেবাসে পরিবর্তন কেন হয়?

তবে এখন আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, পরবর্তীতে এগুলো দারুল উলূম দেওবন্দের পাঠ্যসূচি থেকে কেন বাদ দেয়া হল? সত্যিই, আমি স্বীকার করি, তার সন্তুষজনক উত্তর দিতে আমি অপারগ। হতে পারে পরবর্তীতে সময়ের বিবর্তনের কারণে ঐ সকল শাস্ত্র সঠিক ও সুন্দরভাবে পাঠদানের মত এমন যোগ্য শিক্ষক বিরল হয়ে যায়, যাঁরা এ সকল বিষয়ে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত নন। হয়ত এটি এজন্য হয়েছিল যে, পরবর্তীতে আমাদের দেশীয় ইউনিভার্সিটিসমূহে এই সকল শাস্ত্রের পাঠদান শুরু হয়, যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চেয়ে অধিক পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতির শিক্ষা দেয়া হত। তাই আমাদের পরবর্তী আকাবিরিন এই সকল শাস্ত্র ও জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত থাকা সহ্য করে নিলেন, কিন্তু সভ্যতার পরাজয়কে মেনে নিতে প্রস্তুত হননি….।

সভ্যতার পরাজয় মেনে নেয়া যাবে না

আমি নিশ্চিন্তে ও নির্দ্বিধায় বলছি যে, [আল্লাহ না করুন] যদি আমরাও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, তথা এ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শাস্ত্রগুলো অর্জন করতে গিয়ে ‘চরিত্র ও আধ্যাত্মিকতায়’ ব্যাঘাত হয় বা ‘শরিয়ত ও সুন্নাহ’ থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং পশ্চিমাদের নাস্তিক্যবাদী সায়েন্সের জাদুতে প্রভাবিত হওয়ার ভয় হয়, তখন এ জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়াকে সহ্য করে নিতে হবে, যতক্ষণ না এই পরিস্থিতির অবসান ঘটে বা তা থেকে মুক্তির পরিবেশ তৈরি হয়।

হতে পারে আমার এই অনুভূতি ঘটে বা তা থেকে মুক্তির পরিবেশ তৈরি হয়।

হতে পারে আমারই অনুভূতি শুনে আপনাদের অনেকের মনে এই ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, পরিশেষে এই ‘সাজ্জাদ সাহেব’ও তো একজন ‘মাওলাভী’! তিনি এছাড়া আর কি বলতে পারবেন??

তাহলে শুনুন, আপনারা হয়ত ‘লিউপুল্ড ওয়িস’ [Leopold Weiss] এর নাম শুনেছেন। তিনি একজন অস্ট্রিয়ার সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। আল্লাহর তাওফীকে ঈমান গ্রহণ করেছেন এবং অনেক মূল্যবান কিতাবাদী রচনা করেছেন। তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব [Islam at the crossroads] এ লিখেন;

শিক্ষাঙ্গণে আমাদের পশ্চাদপদতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমাদের পুঁজিহীনতা ঐ ধ্বংসাত্মক প্রভাবের তুলনায় কিছুই নয়, যা পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধ অনুকরণ ইসলামের সূক্ষ্ণ ধর্মীয় শক্তির ওপর বিস্তার করবে। আমরা যদি ইসলামকে একটি স্বতন্ত্র সভ্যতা ও দীন হিসাবে রক্ষা করতে চাই তাহলে আমাদেরকে পশ্চিমা সভ্যতার আভাস ও প্রভাব থেকে বহু দূরে অবস্থান করতে হবে, যে সভ্যতা আমাদের সমাজ ও ইচ্ছার ওপর বিজয় অর্জন করার জন্য সদা প্রস্তুত, কারণ পশ্চিমাদের চাল-চলন, পোশাক-আশাক ও জীবন-চরিত্র অবলম্বন করার দ্বারা মুসলমানরা ধীরে ধীরে পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়ে যাবে, যেহেতু বাহ্যিক বেশ-ভূষের অনুকরণ অন্তরের বিশ্বাসে পরিবর্তন ঘটায়।

পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধ অনুসরণ নয়

আশা করি একজন পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীর বক্তব্যের ‘নির্বাচিত অংশ’ পেশ করার পিছনে আমার উদ্দেশ্যে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। মূলতঃ আমি এটিই বলতে চাচ্ছি যে, যদি একজন পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীও মনে করেন যে, পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধ অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকা আমাদের অবশ্য কর্তব্য; যদিও তাতে শিক্ষাঙ্গণে পশ্চাদপদতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে পুঁজি হীনতার স্বীকার হতে হয়…।

তাহলে আমাদের এই প্রবীন ও দূর্দশী উলামায়ে কেরাম থেকে এ ছাড়া আর কি আশা করা যেতে পারে? তাঁরা যদি উক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাঁরা কি ভুল করেছেন?

যাই হোক, আমাদের মতে এখন সময়ের দাবী যে, আমরা নিকটবর্তী অতীত ও দূরবর্তী অতীত উভয় যুগের আকাবির ও আসলাফের মতাদর্শের প্রতি ফিরে যাওয়ার একটি বুদ্ধিভিত্তিক প্রয়াস; সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও সর্বোচ্চ সাবধানতার সাথে প্রেক্টিকেলি আরম্ভ করি।

নিকটবর্তী অতীতের আকাবির দ্বারা আমার উদ্দেশ্য হলো দারুল উলূম দেওবন্দের আকাবিরগণ-(এ সম্পর্কে নদওয়াতুল উলামা ও তার মহান ব্যক্তিত্বগণের দৃষ্টিভঙ্গি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট, তাই তাঁদের আলোচনা প্রয়োজন মনে করিনি। সত্যিই, এ বিষয়েও আমার নিকট দারুল উলূম দেওবন্দ ও নদওয়াতুল উলামার আকাবিরগণের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য অনুভূত হয় না।) এবং দূরবর্তী অতীতের আকাবির দ্বারা উদ্দেশ্য; ঐ সকল উলামায়ে কেরাম ও দার্শনিক যাঁরা মূলতঃ সায়েন্স ও বিজ্ঞান শাস্ত্রের আবিষ্কারক ছিলেন।

বিজ্ঞান শাস্ত্রের আবিষ্কার

নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার আবিষ্কারক আমাদের পূর্ববর্তী আকাবির ও আসলাফগণই ছিলেন; যাঁরা কুরআনে কারীমের আদেশ পালনার্থে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন বস্তুর পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন শুরু করেছিলেন। কেননা তাদেরকে অবহিত করা হয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও গুণাবলী এবং তাঁর সৌন্দর্যের নিদর্শন ও মহত্ত্বের সুদর্শন তাঁরই সৃষ্টিজগতে বিরাজমান। অতএব তাঁরা আল্লাহর মারেফত ও তাঁর পরিচয় লাভের জন্যই সৃষ্টিজগতের অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ করেন এবং তা দ্বারা ফলাফল অর্জন করেন এবং তা কিতাবাদিতে লিপিবদ্ধ করেন। বর্তমানে ঐ ধরনের ফলাফলসমূহকে সায়েন্স বা বিজ্ঞান বলা হচ্ছে।

যেহেতু পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানীদের ‘বিজ্ঞান আবিষ্কার’ আল্লাহর আকিদা-বিশ্বাস থেকেই সৃষ্টি হয়, তাই তাদের এই বিজ্ঞান স্রষ্টার আকিদা-বিশ্বাসের আশপাশে ঘুর্নীয়মান থাকত এবং তা থেকে অর্জিত যোগ্যতা ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি দ্বারা তৈরিকৃত সরাঞ্জাম আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবতার মুক্তি এবং জনসেবা মূলক কাজেই ব্যবহৃত হত।

খোদাদ্রোহী বিজ্ঞানের সূচনা

যখন স্পেনে মুসলমানদের রাজনৈতিক অবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও মতানৈক্যের কারণে ভেঙ্গে পড়ল এবং তারা স্পেন থেকে বের হতে বাধ্য হল তখন সায়েন্স ইউরোপের ঐ সকল ব্যক্তিদের হাতে চলে যায় যারা মূলতঃ বিকৃত ও রহিত খৃস্টান [Paulism] ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারণে কিংবা বিবেক-বুদ্ধি ও ন্যায়-ইনসাফের সাথে সাংঘর্ষিক মন-মানসিকতার ফলে ধর্ম ও ধার্মিকদের ওপর খুবই বিক্ষুদ্ধ ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, দীন ও দুনিয়া দু’টি পৃথক পৃথক বস্তু। সুতরাং পার্থিব জ্ঞান তথা সায়েন্স-টেকনোলজির সাথে স্রষ্টার কোনো সম্পর্ক নেই। এভাবে সায়েন্স থেকে স্রষ্টার বিশ্বাস বের করে দেয়া হয়।

এটি মূলতঃ এক অস্তিত্বকে পৃথক করে দুই প্রকারে বিন্যস্ত করার ও সৃষ্টজগতকে দু’ভাগে বিভক্ত করার যুক্তিহীন ও ভিত্তিহীন একটি অপকৌশল ছিল, যার পক্ষে না কোনো জ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ আছে, না যুক্তিভিত্তিক দলিল। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানের নাস্তিকতা বা ‘স্রষ্টা অস্বীকারের বিশ্বাস’ পশ্চিমাবিশ্বের খৃস্টানদেরকে গ্রাস করে নিল, [যা মূলতঃ খৃস্টান ধর্মের বিকৃতির কারণে বা তাদের আচরণের ফলে সৃষ্ট একটি মতবাদ ছিল]

‘বস্তুবাদ’ ও ডারইনের ‘বিবর্তনবাদ’

পরবর্তীতে এমন ‘বৈজ্ঞানিক মতবাদ’ সৃষ্টি হয়, যা মূলতঃ তাদের আকিদা-বিশ্বাসের ফসল, কিন্তু এই মতবাদকে তার পরিমাণ মনে না করে তার উৎস ও প্রমাণ মনে করতে লাগল। উনবিংশ শতাব্দীর ‘বস্তুবাদ ও ডারইনের ‘বিবর্তনবাদকে ঐ সকল ‘বৈজ্ঞানিক মতবাদ’-এর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তিনি এই অবাস্তব ধারণাকে একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা আখ্যা দিয়ে বলেন; সৃষ্টি জগতের কোনো স্রষ্টা ও পরিচালক নেই এবং জগতের সৃষ্টি ও পরিচালনার ব্যাখ্যা জন্য স্রষ্টাবিশ্বাসী হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।

তার পরিমাণ দাঁড়াল, মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যায় যে, সায়েন্সের নাস্তিকতা মূলতঃ বিকৃত খৃস্টানধর্মের সৃষ্ট একটি ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল বরং মনে করতে লাগল যে, এটি বিজ্ঞানেরই একটি অপরিহার্য বিষয়।

পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের হঠকারিতা

বর্তমানেও পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা এই প্রচেষ্টায় নিয়োজিত যে, কিভাবে বিজ্ঞানকে ঐ সকল পথ থেকে মুক্ত রাখা যায় যা মানুষকে স্রষ্টা বিশ্বাসের প্রতি নিয়ে যায়? কিভাবে তাকে নাস্তিকতার অযৌক্তিক বিশ্বাসের বেষ্টনীতে কঠোরভাবে আবদ্ধ রাখা যায়? তাই তারা এমন বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলে যা স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর অসাধারণ শক্তির প্রমাণ বহন করে; তা যতই অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য হোক না কেন।

যদিও বিজ্ঞান স্রষ্টাল অস্তিত্বকে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করে না, কিন্তু সৃষ্টজীব নিয়ে তাদের অধ্যয়ন ও গবেষণা পদ্ধতি দ্বারা মনে হয় যে, জগতের কোনো স্রষ্টা নেই, আর থাকলেও সৃষ্টিজগতে তাঁর গুণাবলীর কোনো নির্দশন নেই। এভাবে তারা সে দরোজাটি বদ্ধ করে দেয় যার মাধ্যমে স্রষ্টার পরিচয় ও তাঁর ভালোবাসার নূর মানুষের হৃদয়গৃহে পৌঁছে থাকে।

আল্লাহর পরিচয় লাভের মাধ্যম

[০১] মানবতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনই ঘোষণা দিল যে, সৃষ্টিজগতে বিক্ষিপ্ত আল্লাহর সিফাত ও গুণাবলীর পর্যবেক্ষণ এবং তাতে গবেষণাও আল্লাহর পরিচয় লাভের একটি মাধ্যম এবং সেই পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা দ্বারা আল্লাহর সিফাত [গুণবাচক নাম] স্রষ্টা, প্রতিপালক, দয়ালু, দাতা, ন্যায়বান, রক্ষক, জ্ঞানী, শ্রবণকারী, পর্যবেক্ষণকারী, শক্তিশালী ইত্যাদির অর্থ অনুধাবন করা যায়।

[০২] অনুরূপভাবে কুরআন বলে যে, আল্লাহর মারেফত ও পরিচয় লাভের আরেকটি মাধ্যম হল ‘জিকির’, যার সাহায্যে আল্লাহর নৈকট্যের অনুভূতি জাগে।

স্রষ্টা অবিশ্বাসী মতবাদ

প্রিয় উপস্থিতি! নাস্তিক্যবাদী বিজ্ঞানের এই যুগে যত ধরনের দর্শন ও মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে সবগুলো স্রষ্টা অবিশ্বাসী ও খোদাদ্রোহী; যেমন, ডারইনিজম, মার্কসিজম, ফরাইডিজম, লজিকেল পাজিটিউজম, হিউমেনিজম। অনুরূপভাবে নাস্তিক্যবাদী রাজনীতি ও অর্থনীতি, স্রষ্টা অবিশ্বাসী শিক্ষাব্যবস্থা ও চরিত্রগঠন এবং খোদাদ্রোহী ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোবিজ্ঞান ও সমাজকেন্দ্রিক মনোবিজ্ঞান।

খোদাদ্রোহী বিজ্ঞানের ক্ষয়-ক্ষতি

সুতরাং জেনে রাখুন, বিজ্ঞান খোদাদ্রোহী হওয়া কোনো সাধারণ ও অক্ষতিকর পরিবর্তন নয়, যা কেবল বই-পুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বরং এটি মানুষের সকল আকিদা-বিশ্বাস, প্লান-পরিকল্পনা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, মর্যাদা ও মূল্যবোধ [Values] এবং ভালোমন্দের মাপকাঠি এমনকি আশা-আকাঙ্ক্ষাও পরিবর্তন করে দিয়েছে।

মহাবিপ্লবের ডাক

এখন যদি কেউ এই বিশ্বময় সংঘাতের অবসান ও মানবজাতিকে পুনরায় মানবতার পথে ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে তাকে এই বিজ্ঞান ও তা থেকে অর্জিত গবেষণা পদ্ধতিকে আল্লাহর মা’রেফত ও মানবতার সেবা; এই দুই উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত করার جهاد كبير ‘মহাবিপ্লব’ চালিয়ে যেতে হবে এবং বিজ্ঞান ও সকল জ্ঞান-শাস্ত্রকে আল্লাহর কিতাবের সাথে সুজিড়ে পড়া ও পড়ানোর রীতি নতুনভাবে জীবিত করার অবিরাম প্রয়াস চালাতে হবে, অন্যভাষায় কিতাবে হিদায়াত-কুরআন মজিদ ও কিতাবে কায়েনাত-সৃষ্টিজগত (যা মূলত একটি অপরটির ব্যাখ্যা করে থাকে) একটিকে অপরটির সাথে সম্পৃক্ত করার অক্লান্ত চেষ্টা করতে হবে।

দারুল উলূম ইমামে রব্বানীর শিক্ষাদীক্ষা

আশা করি আপনারা এখন ভালোভাবে বুঝে গেছেন যে, বর্তমানে ভুলবশত যে সকল শাস্ত্র ও জ্ঞানকে ‘আধুনিক জ্ঞান’ বা পাশ্চাত্য জ্ঞান বলা হয় এবং যে জ্ঞানসমূহকে শুধুমাত্র উপার্জনের মাধ্যম মনে করা হয়, তা দারুল উলূম ইমামে রব্বানী পাঠ্যসূচীতে কোন উদ্দেশ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? এবং তা কোন পদ্ধতিতে পড়ানো হচ্ছে?

আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ ও তাওফীকে আকাবিরীনদের সাথে এখানকার খাদিমদের যে ক্ষুদ্র সম্পর্ক ও নিসবত রয়েছে এবং তাঁদের রুচি ও স্বভাবের সাথে যে সাদৃশ্যতা নসীব হয়েছে, তার বরকতে এখানে পরিবেশ তৈরি হয়েছে যার তত্ত্বাবধানে ইনশাআল্লাহ এখানকার ছাত্ররা পশ্চিমা সভ্যতা ও তার ঘৃণিত প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে এই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শাস্ত্রগুলো অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং আল্লাহ তাআলার অপরিবর্তনশীল নীতি إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيِّاتِ. [কর্মের ফলাফল তাই হয় যা তার মৌলিক উদ্দেশ্য হয়ে থাকে] অনুযায়ী এই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বারা প্রথমত তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলার মহত্ত্ব ও বড়ত্ত্বের অনুভূতি এবং আখিরাতের চিন্তা-চেতনার মত উত্তম গুণাবলীই সৃষ্টি হবে। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে তারা ইসলাম ও মানবতার উত্তম খেদমত আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবেন।

ইমাম ওলী উল্লাহ দেওলভী ইনস্টিটিউট

জনাব! আমি আপনাদের যথেষ্ট সময় নিয়ে নিলাম, তা সত্ত্বেও এখানকার আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘ইমাম ওলী উল্লাহ দেহলভী ইনস্টিটিউট’ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারলাম না। সংক্ষিপ্তাকারে এইটুকু জেনে নিন; বর্তমান সময়ে আলেম সমাজের জন্য দুই ধরনের যোগ্যতার বড় প্রয়োজন। [০১] ইতিবাচক, পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ রুচি ও স্বভাবের অধিকারী হওয়া। [০২] ইসলামের এমন ব্যাখ্যা-বিশেّষণের যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করা, যাতে একদিকে আধুনিক যুগের চাহিদা ও সাধারণ শিক্ষিত সমাজের মেধার পূর্ণ লক্ষ্য রাখা হবে, অপরদিকে কুরআন সুন্নাত এবং পূর্বসূরী আকাবির ও আসলাফের নির্ধারণকৃত সীমা থেকে বিন্দু পরিমাণও অতিক্রম করা হবে না।

চলমান যুগের মুজাদ্দিদ ইমাম শাহ ওলী উল্লাহ উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.-এর জ্ঞানভা-ার, চিন্তা-চেতনা এবং তাঁর রচনাবলী গভীরভাবে অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার মাধ্যমেই এই দুই ধরনের যোগ্যতা অর্জনের সর্বোচ্চ দিকনির্দেশনা আমরা পেতে পারি। অতএব উক্ত ‘ইনস্টিটিইউটে’ যুবক উলামায়ে কেরামকে এই দক্ষতা ও যোগ্যতা, রুচি ও স্বভাবের অধিকারী হিসাবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।

পাশাপাশি তাদেরকে ইংরেজী ভাষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়েরও শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এই ছিল ঐ সকল খেদমতের সংক্ষিপ্ত আলোচনা যা এখানকার শিক্ষাঙ্গণে আঞ্জাম দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন আপনি বুঝতে পারেন, এই সকল কাজের জন্য কেমন যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের এবং কত সরঞ্জামের প্রয়োজন?

আহ! যদি জাতির প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে দীনের জন্য নিজের জান-মাল, ধন-সম্পদ ও সর্বস্ব উৎসর্গ করার আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি হয়ে যেত।

নিঃসন্দেহে তখন দুনিয়া-আখেরাত উভয়টি সুন্দর ও সফল হয়ে যাবে!!!!

পরিশেষে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরূদ ও সালামের হাদিয়া পেশ করছি এবং নিজের ভুলত্রম্নটির ওপর লজ্জিত হয়ে সহস্র বার ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

অনুবাদ : সালিমুদ্দীন মাহদি

অধ্যয়নরত, ইমাম ওলী উল্লাহ দেহলভী ইনস্টিটিউট

রায়গড়, মহারাষ্ট্র, ভারত।
http://tablignewsbd.com/archives/11224

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *